
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল–বহনকারী দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আজ ভয়াবহ পরিবেশগত অবক্ষয়ের মুখে। সরকারি অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং অবৈধ নির্মাণ কয়েক দশক ধরে দ্বীপটির ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। বহুল প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দ্বীপটি প্রকৃত প্রবাল দ্বীপ নয়; বরং প্রবাল–সমৃদ্ধ একটি অনন্য পরিবেশ।
১৯৮০ সালে দ্বীপে বাসিন্দা ছিল মাত্র তিন হাজার। ছিল একটি নৌকাঘাট, কয়েকটি দোকান, একটি স্কুল ও কিছু মক্তব। আজ সেখানে জনসংখ্যা প্রায় ১২ হাজার এবং প্রতি বছর লাখো পর্যটকের আগমন দ্বীপের পরিবেশকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
পর্যটন–নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হোটেল, রিসোর্ট, সরকারি অফিস ও অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। দ্বীপের লেগুন, মিঠাপানির পুকুর, ম্যানগ্রোভ ঝোপ, প্রবাল–বোল্ডার এবং কেয়াগাছের সুরক্ষাবলয় ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে আশপাশের সমুদ্র প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁগুলোকে এখন মূল ভূখণ্ড থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে জীবিত প্রবাল, শামুক, ঝিনুক ও রঙিন সামুদ্রিক প্রাণী সংগ্রহও পরিবেশগত ক্ষতি বাড়িয়েছে।
দ্বীপের অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মানব–বর্জ্যের কারণে দূষিত হয়ে পড়ছে। শৌচাগারের বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক এবং নর্দমার জল খাদ্য ও পানির মূল উৎসে মিশে সম্ভাব্য জনস্বাস্থ্য–বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা এবং জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেয়াবনের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ধ্বংস হওয়ায় ক্ষয়–সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসের পর্যটন নিষেধাজ্ঞা দ্বীপে পরিবেশগত পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। কেওড়া, অ্যাভিসেনিয়া, নিশিন্দা, ভাইটেক্সসহ স্থানীয় উদ্ভিদ দ্রুত পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। সৈকতে সৈনিক কাঁকড়ার সংখ্যা বেড়েছে এবং অলিভ রিডলে কচ্ছপের আগাম বাসা বাঁধা আশার আলো দেখিয়েছে। ছেঁড়াদিয়ার দক্ষিণাংশে প্রাকৃতিক বন গড়ে উঠেছে।
এই সবই প্রমাণ করে—মানুষের চাপ কমলেই সেন্ট মার্টিন নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে।
অবৈধ নির্মাণ, হোটেলের উজ্জ্বল আলোতে কচ্ছপশিশুদের বিভ্রান্তি এবং জনবহুল কুকুরের উৎপাত—সবই দ্বীপের পুনরুদ্ধান বাধাগ্রস্ত করছে। কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও সার্বক্ষণিক নজরদারির অভাব প্রকট।
বিশেষজ্ঞরা দ্বীপ রক্ষায় নিম্নোক্ত কাজগুলো জরুরি মনে করছেন:
প্রতিদিন আবর্জনা সংগ্রহ ও সঠিক নিষ্পত্তি
সৈকতে মোটরচালিত গাড়ি নিষিদ্ধ
কংক্রিট স্থাপনা নির্মাণে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা
সৌর শক্তি ও বৃষ্টির জল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা
ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন
নৌকা ও পর্যটন কার্যক্রমে কঠোর নিয়মাবলি
স্থানীয়দের নিয়ে জীববৈচিত্র্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন
দ্বীপজুড়ে কেওড়া ও নিশিন্দার বনের প্রাচীর তৈরি
লেগুনে নিয়মিত জোয়ার–প্রবাহ নিশ্চিত
তিনটি ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ ‘নো-গো জোন’ ঘোষণা
সমুদ্রসীমায় এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা নিষিদ্ধ
কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও অপসারণ
কচ্ছপ বাসাস্থল ২৪ ঘণ্টা নজরদারি
দৈনিক ২,০০০ দর্শনার্থীর সীমা বজায় রাখা
মার্চ–অক্টোবর দ্বীপ বন্ধ রাখা
রাতের আলো ও শব্দ নিষিদ্ধ
পলিথিন নিষিদ্ধ করে কাপড়/চটের ব্যাগ চালু
সৌরচালিত তিনচাকার যান ব্যবস্থাপনা
সেন্ট মার্টিন নিছক বিনোদনস্থল নয়—এটি বাংলাদেশের অনন্য পরিবেশগত ঐতিহ্য। সীমিত সময়ের এই সুযোগে বিজ্ঞানভিত্তিক স্থায়ী পরিকল্পনা নেওয়া না হলে ক্ষতি হবে অপূরণীয়। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দ্বীপটি রক্ষা করবে, নাকি ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবে।